Munda Tribe


শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘শব্দ মুণ্ড’ থেকে। এর অর্থ ‘মাথা'(প্রধান)।মুণ্ডা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সমাজ ব্যবস্থাপনায় রাজতন্ত্র চালু। ‘রঙ সভা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি বছর নির্বাচন করা হয় রাজা, মন্ত্রী, চৌধুরী, ডাকুয়া। বংশানুক্রমে রাজ্য শাসন করেন রাজা।
তারা যে ভাষায় কথা বলে তা মুণ্ডারি। অস্ট্রিয়া-এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত এটি। ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গে এদের বাস। বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলেও অস্তিত্ব রয়েছে এ গোষ্ঠীর। মুণ্ডারা শুরু থেকেই বন-জঙ্গল, মাটি কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত। চা বাগানেও কাজ করেন অনেকে। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসছে তাদের পেশায়। এখন এদের কেউ কেউ কৃষিকাজ, মাছ ধরা, ভ্যান গাড়ি চালান। কেউ স্বল্প পুঁজি নিয়ে করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসা।
মুণ্ডাদের ঘর-দোর সাধারণত মাটির তৈরি। তবে অবস্থাপন্নদের অনেকেই দোতলা বাড়িতে বাস করেন। প্রতিটি ঘরের রয়েছে আলাদা নাম। রান্নার ঘরকে তারা বলে ‘হাইসাল ঘর’, শোয়ার ঘর ‘সুতেক ঘর’। স্থানাভাব না থাকলে গরুর ঘর তৈরি করে। ঠাকুর ঘর পরিচিত ‘পূজার ঘর’ হিসেবে। মুণ্ডারা কয়েক গোত্রে বিভক্ত। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, নিয়মনীতি মেনে চলে গোত্রের নিজস্ব ধারায়। গোত্রগুলোর মধ্যে নেই কোনো শ্রেণীবৈষম্য। সব গোত্রই সমান। পোশাক-আশাকে তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই বললেই চলে। পুরুষদের পরিচ্ছদের নাম ‘হাতকা’। এর অর্থ পাঁচ হাত সাদা মার্কিন। মেয়েরা শাড়িতেই অভ্যস্ত। অবস্থাপন্ন মুণ্ডারা স্বর্ণের গহনা ব্যবহারই করে থাকে। তবে এদের বেশির ভাগই গরিব।রূপোর তৈরি বিভিন্ন গহনাও ব্যবহৃত হয়। মুণ্ডারা আগে কাঁসা-দস্তার বাসন-কোসনই ব্যবহার করত। কিন্তু এখন এর স্থান দখল করে নিয়েছে স্টিল।
মুণ্ডাদের প্রধান খাদ্য ভাত। আমিষভোজী মুণ্ডাদের খাদ্য তালিকায় আরো রয়েছে কাঁকড়া, শামুক, শূকর, ইঁদুর। তবে গরুর মাংস একেবারেই নয়। শূকর ও দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাদ্য তাদের বেশ প্রিয়। রান্নায় ব্যবহার হয় সরষের তেল। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানে আলপনা বা নকশা আঁকে। নানা রকম রোগ নিরাময়ে ভরসা করে কবিরাজের ওপর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওঝা ফকিরের শরণাপন্ন হয় তারা।
মুণ্ডাদের স্বগোত্রে বিয়ে একেবারেই নিষিদ্ধ। বিয়ের আগে মুখ দেখা অনুষ্ঠান হয়। পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে পছন্দ হলে বেজে ওঠে বিয়ের বাদ্যি। বিয়ের রীতিনীতি অনেকটা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতোই।
সমাজেও নবজাতককে স্বাগত জানাতে করা হয় নানা আচার অনুষ্ঠান। শিশু জন্মের নবম দিনে শিশুর মাথার চুল ও মায়ের হাত ও পায়ের নখ কাটা হয়। অনুষ্ঠানটিকে বলে নর্তা। ২১ দিনের মাথায় মা ও শিশুকে স্নান করানো হয়। ওইদিন করা হয় শারল দেবতার পূজা। সেদিন উৎসর্গ করা লাল মোরগের রক্ত পান করতে হয় মাকে। এতে মা পাপমুক্ত হবে বলে তারা বিশ্বাস করে।
কেউ মারা গেলে মৃতের পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনরা চিড়ে, গুড়, কলা, ফলমূল খেয়ে থাকে। মরদেহ সৎকারের একদিন পর আগুন জ্বালে। মৃত্যু-পরবর্তী দশদিন লবণ, তেল-হলুদ ছাড়া রান্না করা খাবার গ্রহণ করে তারা। মুখাগ্নিদাতা ব্যক্তি প্রতিদিন মৃত ব্যক্তির উদ্দশ্যে খাবার নিবেদন করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘দানি দেয়া’। দশদিন অশৌচ পালনের পর পরিবারের সবাই নদীর ঘাটে গিয়ে ক্ষৌরকর্ম সম্পন্ন করে। ১১ দিনে পুরোহিতের মাধ্যমে আয়োজন করা হয় গোমঘারা নামক পূজার। পূজা শেষে আত্মীয়স্বজনসহ উপস্থিত সবাইকে খাওয়ানো হয়। চৌধুরি, নাপিত, ধোপা, পুরোহিতদের ‘সেরসিদ্ধি’ দিয়ে বিদায় করা হয়। সেরসিদ্ধিতে থাকে চাল, বস্ত্র, জল, দক্ষিণাসহ অনেক কিছু।
পশ্চিম মেদিনীপুরে আদিবাসী জনজাতিগুলির মধ্যে জনসংখ্যার বিচারে সাঁওতালদের পরেই আছেন মুণ্ডারা। ঝাড়গ্রাম মহকুমার গোপীবল্লভপুর ১ ও ২, নয়াগ্রাম ও সাঁকরাইল ব্লকের সুবর্ণরেখা লাগোয়া এলাকায় তাঁদের বসবাস সবচেয়ে বেশি।
মুদ্রিত সাহিত্য অথবা সংকলিত সঙ্গীতের নিরিখে সাঁওতালদের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন বলে মুণ্ডা সমাজের কর্তাব্যক্তিরা মনে করছেন। সাঁওতালির জন্য অলচিকি লিপি রয়েছে। কিন্তু মুণ্ডাদের ভাষা মুণ্ডারির সরকার- স্বীকৃত কোনও লিপি নেই। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মুণ্ডারি কথ্যভাষাও প্রায় ভুলতে বসেছে বলে আক্ষেপ প্রবীণদের। এ রাজ্যে বাংলা হরফে মুণ্ডারি ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। বছর দুই আগে প্রকাশিত শ্রীহরি সিংহের লেখা মুণ্ডারি সাসাংকির (মুণ্ডারি সংস্কৃতি) বইটি জেলায় মুণ্ডারি ভাষার মুদ্রিত প্রথম বই। এত দিন মুণ্ডারি গানের ক্যাসেট বা সিডি ছিল না। তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী মুণ্ডা সমাজ সুসার সঙ্ঘ-এর ঝাড়গ্রাম টাউন কমিটির উদ্যোগে এবং মহকুমা তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের আর্থিক সহযোগিতায় দশটি গানের অডিও সিডি সুড়া সাকাম্‌ (নতুন পাতার সৃষ্টি) প্রকাশিত হয়েছে। গানের বিষয় কারাম (বপন), দং (প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠান), আঁদি (বিবাহ), যাদুর (বিরহ), বাদি (আধুনিকতা) ইত্যাদি। এই চেষ্টা মুণ্ডা সমাজের আক্ষেপ হয়তো কিছুটা কমাবে।পৃথিবী থেকে অনেক জাতি , ভাষা, তো লোপ পেয়েইছে ,আরো একটি সুস্হ সংস্কৃতি যাতে লুপ্ত না হয়ে যায় , অবিলম্বে তার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
***Mission Geography***

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s