মাউন্ট এভারেস্ট এবং মাউন্ট এভারেস্ট বিজয় অভিযান ইতিহাস


” মাউন্ট এভারেস্ট এবং
মাউন্ট এভারেস্ট বিজয় অভিযান
ইতিহাস ”
Writer – Arijit Dabangg Sinha
★★★★★★★★★★★★★★★★★★
মাউন্ট এভারেস্ট হল পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ।
এশিয়া মহাদেশের হিমালয় পর্বতের মহালাঙ্গুর হিমাল
রেঞ্জে অবস্থিত মাউন্ট এভারেস্টের সমুদ্রপৃষ্ঠ
থেকে উচ্চতা হল ৮৮৪৮ মিটার বা ২৯,০২৮ ফুট। এটি
নেপাল-তিব্বত(চীন) সীমান্তে অবস্থিত।
মানচিত্রে মাউন্ট এভারেস্টের অবস্থান হল — ২৮
ডিগ্রি উঃ & ৮৭ ডিগ্রি পূঃ। এই অঞ্চলটি সারাবছর তুষারাবৃত থাকে ও কোনো প্রকার জীবিত প্রাণী দেখা
যায় না। তবে অত্যধিক উত্তর-পশ্চিম ঝটিকা বায়ুর জন্য
শৃঙ্গদেশ তুলনামূলক ভাবে তুষারমুক্ত থাকে। মাউন্ট
এভারেস্টের চারিপাশের প্রধান হিমবাহ গুলি হল —
পূর্বের কাংশুং হিমবাহ ; উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমের
রংবুক হিমবাহ ; পশ্চিম ও দক্ষিনের খুম্বু হিমবাহ প্রভৃতি।
মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গের ১২০০০-১৩০০০ ফুট
পর্যন্ত উচ্চতায় জনবসতি দেখা যায়। তিব্বতী ভাষায়
মাউন্ট এভারেস্টের নাম হল — “চোমোলুংমা”, যার
অর্থ হল – “বিশ্বের মাতৃদেবী”। মাউন্ট
এভারেস্টই যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, ১৮৬২
সালের পূর্বে এই তথ্য অজানা ছিল। প্রথমে এই
শৃঙ্গের নাম ছিল ‘h’ (ইংরাজি অক্ষর অনুসারে)।
পরবর্তীকালে ১৮৪৯-৫০ সালে এই শৃঙ্গের
নামকরন করা হয় ‘PEAK XV’ বা পঞ্চদশ শৃঙ্গ। ১৮৬২
সালে, ১৮,২৮৮ ফুট বা তার বেশি উচ্চতাযুক্ত ৪০ টি
গিরিশৃঙ্গের পরিমাপ শেষ হয় এবং তখনই পৃথিবীর
উচ্চতম শৃঙ্গ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়। ১৮৬৫
সালে স্যার জর্জ এভারেস্ট (ব্রিটিশ ভারতের
সার্ভেয়ার জেনারেল – ১৮২৩-৪৩) এর নামানুসারে
এই শৃঙ্গের নামকরন করা হয় — “মাউন্ট এভারেস্ট”।
১৯৫২-৫৫ সালে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা
সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে — মাউন্ট
এভারেস্টের উচ্চতা ৮৮৪৮ মিটার বা ২৯,০২৮ ফুট। এই
বিষয়ে বিখ্যাত জরিপবিদ রাধানাথ শিকদারের অবদান
বিশেষ স্মরনীয়। তিনিই প্রথম মাউন্ট এভারেস্টের
উচ্চতা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করেন। নেপালি ভাষায়,
মাউন্ট এভারেস্ট-কে “সাগরমাতা” বলা হয়।
মাউন্ট এভারেস্ট বিজয় অভিযান ইতিহাস
১৯৫৩ সালের ২৯ শে মে, তেনজিং নোরকে
(ভারত) ও এডমন্ড হিলারি (নিউজিল্যান্ড) সর্বপ্রথম
পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ – ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ জয়
করেন। বিশ্বের পর্বতারোহণের ইতিহাসে এটি
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন ও ঘটনা। কিন্তু
১৯৫৩ সালে নোরকে ও হিলারি মাউন্ট এভারেস্ট
জয় করার পূর্বে, মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের একটি
তিন দশকের বেশি পুরানো ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫৩
সালে নোরকে – হিলারির পূর্বে ৭ টি অভিযাত্রী
দল ও ৩ টি প্রাথমিক পর্যবেক্ষন দল ১৯২১-৫২
সময়কালে মাউন্ট এভারেস্ট অভিযান করেছিলেন।
১৮৮৫ সালে Alpine Club এর সভাপতি ক্লিন্টন থমাস
ডেন্ট, তাঁর “Above the Snow Line” গ্রন্থে প্রথম
মাউন্ট এভারেস্ট আরোহন সম্ভবের কথা বলেন।
নিচে, সেই বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস সংক্ষেপে
আলোচনা করা হল —-
★১) প্রথম প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ দলঃ- ১৯২১ সালে
সর্বপ্রথম মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের জন্য
প্রাথমিক দল গঠিত হয়। এই দলের নেতৃত্বে
ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাওয়ার্ড ব্যুরি।
প্রথম প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ দলের অন্যান্য সদস্যরা
হলেন — মালোরি, বুলক, রাইবার্ন, ওলাসটন, হুইলার,
হেরণ প্রমুখ। এই দলটি ২২,০০০ ফুট বা ৬৭০৫ মিটার
উচ্চতা পর্যন্ত আরোহন করেন ও হিমালয়ের নানা
পথঘাট আবিষ্কার করেন।
★২) প্রথম অভিযাত্রী দলঃ- ১৯২২ সালে ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল ব্রুসের নেতৃত্বে প্রথম অভিযাত্রী
দলটি গঠিত হয়। এটিই প্রকৃতপক্ষে এভারেস্ট শৃঙ্গ
বিজয় অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ। এই দলের
অন্যান্য সদস্যরা হলেন — ক্রুফোর্ড, মরিস,
নোয়েল, কিনচ্, নর্টন, লংস্টাফ, মালোরি, মর্সহেড
প্রমুখ। দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ব্যাপী অভিযানে এই
দলটি মোট ৩ বার প্রচেষ্টা করেন এবং কিনচ্-ক্রস
২৭,৩০০ ফুট বা ৮৩২৭ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আরোহন
করেন।
★৩) দ্বিতীয় অভিযাত্রী দলঃ- ১৯২৪ সালে
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রুসের নেতৃত্বে
দ্বিতীয় অভিযাত্রী দল গঠিত হয়। এই দলের
অন্যান্য সদস্যরা হলেন — মালোরি, নর্টন,
নোয়েল, বেথাম, অডেল, হ্যাজার্ড, হিংসটন, আর্ভিন
প্রমুখ। একাধিক প্রচেষ্টায় নর্টন ২৮,০০০ ফুট বা
৮৫৪০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আরোহন করেন।
★৪) তৃতীয় অভিযাত্রী দলঃ- ১৯৩৩ সালে হিউ-
রাটলেজের নেতৃত্বে তৃতীয় অভিযাত্রী দলটি
গঠিত হয়। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন —
ক্যাপ্টেন বীরনাই, কর্নেল বৌস্টেড, ব্রকলব্যাংক,
ম্যাকলিন, শিপটন প্রমুখ। এই দলটি ২৭,৪০০ ফুট বা ৮৩৫১ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আরোহন করেন।
★৫) দ্বিতীয় প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ দলঃ- ১৯৩৫
সালে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় প্রাথমিক
পর্যবেক্ষণ দল গঠিত হয়। এই দলের অন্যান্য
সদস্যরা হলেন — ব্রায়ান্ট, স্কেম্পসর্ণ, স্পেন্ডার,
টিলম্যান প্রমুখ। এই দলটি পূর্ব ও পশ্চিমের একাধিক
শৃঙ্গ আরোহন করেন।
★৬) চতুর্থ অভিযাত্রী দলঃ- ১৯৩৬ সালে হিউ-
রাটলেজের নেতৃত্বে চতুর্থ অভিযাত্রী দলটি
গঠিত হয়। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন —
গ্যাভিন, হ্যারিস, হামফ্রে, মরিস, অলিভার প্রমুখ। প্রবল
তুষারপাত ও অতর্কিত বর্ষার জন্য এই অভিযান ব্যর্থ
হয়।
★৭) পঞ্চম অভিযাত্রী দলঃ- ১৯৩৬ সালে
টিলম্যানের নেতৃত্বে পঞ্চম অভিযাত্রী দলটি
গঠিত হয়। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন —
লয়েড, অডেল, অলিভার, শিপটন, স্মাইথ প্রমুখ। ৭
জন শেরপার সহায়তায়, শিপটন ও স্মাইথ ২৭,২০০ ফুট বা ৮২৯০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আরোহন করেন।
★৮) তৃতীয় প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ দলঃ- ১৯৫১
সালে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে তৃতীয় প্রাথমিক
পর্যবেক্ষণ দলটি গঠিত হয়। এই দলটির অন্যান্য
সদস্যরা হলেন — হিলারি, মারে, ওয়ার্ড, রিডিফোর্ড
প্রমুখ। প্রবল বর্ষার জন্য এই অভিযান ব্যর্থ হয়।
★৯) ষষ্ঠ অভিযাত্রী দলঃ- ১৯৫২ সালে ডুনান্টের
নেতৃত্বে ষষ্ঠ অভিযাত্রী দলটি গঠিত হয়। এই
দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন — অ্যাসপার, চিভ্যালি,
ফ্লোরি, লম্বার্ড, জিমারম্যান প্রমুখ। দুটি উপদলে
বিভক্ত হয়ে, এরা যথাক্রমে ২৬,০৫০ ফুট বা ৭৯৪০
মিটার এবং ২৮,০০০ ফুট বা ৮৫৩৪ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত
আরোহন করেন। তেনজিং নোরকে ছিলেন এই
অভিযাত্রী দলটির এক শেরপা সর্দার।
★১০) সপ্তম অভিযাত্রী দলঃ- ১৯৫২ সালে চিভ্যালির
নেতৃত্বে সপ্তম অভিযাত্রী দলটি গঠিত হয়। এই
দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন — বুজিও, গ্রস,
ল্যাম্বার্ট, স্পচেল, ডাইরেনফার্থ প্রমুখ। তীব্র
শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারপাতের জন্য এই অভিযান ব্যর্থ
হয়।
★★ মাউন্ট এভারেস্ট বিজয় ★★
★★★ (২৯ শে মে, ১৯৫৩) ★★★
উপরোক্ত ৭ টি অভিযাত্রী দল ও ৩ টি প্রাথমিক
পর্যবেক্ষণ দল পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট
এভারেস্ট বিজয়ে ব্যর্থ হয়। এরপর, ১৯৫৩ সালে
কর্নেল হান্টের নেতৃত্বে “অষ্টম অভিযাত্রী
দল” গঠিত হয়। এই দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন —
ইভান্স, গ্রেগরি, হিলারি, নয়েস, ওয়ার্ড,
ওয়েস্টম্যাকট প্রমুখ। এই দলের চলচ্চিত্রকার ও
চিকিৎসক ছিলেন যথাক্রমে — স্টবার্ট ও পাফ।
তেনজিং নোরকে ছিলেন এই দলের শেরপা
সর্দার।
১৭ ই মে, ১৯৫৩, এই দলটি ২৪,০০০ ফুট বা ৭৩১৫ মিটার উচ্চতায় প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করেন। পরে বিভিন্ন
দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দিক থেকে আরোহনের
চেষ্টা করেন। ২৬ শে মে, ১৯৫৩, ইভান্স ও তার
সহযোগী ২৮,৭০০ ফুট বা ৮৭৪৭ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত
ওঠেন। ওইসময়, হান্ট ও তার সহযোগী ২৭,৩৫০
ফুট বা ৮৩৩৬ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ওঠেন। ২৮ শে
মে, ১৯৫৩, অষ্টম অভিযাত্রী দলটি ২৭,৯০০ ফুট বা
৮৫০৩ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প স্থাপন করেন। “২৯ শে
মে, ১৯৫৩”, South Col রুটে, তেনজিং নোরকে
ও এডমন্ড হিলারি সকাল ৯ টার সময় শৃঙ্গের খুব কাছে
আসেন এবং সকাল ১১:৩০ নাগাদ মাউন্ট এভারেস্ট জয়
করেন। নোরকে ও হিলারি মাত্র ১৫ মিনিট মাউন্ট
এভারেস্টের সামিটে ছিলেন। দুপুরে শৃঙ্গের
সামিটের কিছুটা নিচে, নোরকে-হিলারির সাথে
লোয়ের সাক্ষাৎ হয়, যিনি তাদের গরম স্যুপ দিয়ে
অভ্যর্থনা করেন। ২ রা জুন, ১৯৫৩ দলটি মূল ক্যাম্পে
ফিরে আসে।
তেনজিং নোরকে & এডমন্ড হিলারি দ্বারা মাউন্ট
এভারেস্ট বিজয়ের পর একটি প্রশ্ন সাধারন মানুষ
থেকে সাংবাদিক, সবার মনে উঁকি দেয় —
“নোরকে না হিলারি–কে প্রথম বা আগে মাউন্ট
এভারেস্টের চূড়া বা সামিটে পৌঁছান?” যদিও তেনজিং
নোরকে পরবর্তী কালে বলেছেন, হিলারিই
প্রথম মাউন্ট এভারেস্টের সামিটে পা রাখেন। তবে
এই প্রশ্নের উত্তরে, ওই অষ্টম অভিযাত্রী
দলের অধিনায়ক কর্নেল হান্টের ঘোষণা
চিরস্মরণীয় — “They reached it together, as a
team.”
*Writer:- Arijit Dabangg Sinha (Parsola, Bankura, Mob:- 8016427527).
—Mission Geography India.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s